,

ThemesBazar.Com

আজও কান্না থামেনি হলি আর্টিজানে নিহত সাইফুলের পরিবারের!

গত ০২বছর অাগে অাজকের ওই দিনটিতে দেশজুড়ে চলছিলো ঈদের আনন্দ অায়োজন। ০৯দিনের লম্বা ছুটি পেয়ে নাড়ির টানে মানুষ রাজধানী ছেড়ে বাড়ি ফিরছিলেন। ঢাকার স্বাভাবিক চাপ কমে গিয়েছিল অনেকটাই। শপিং মলগুলোতে চলছিল শেষ মুহূর্তের বেচাকেনা। ঠিক এমন সময়ই ঈদের ছয় দিন অাগে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় নৃশংস জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে।

২বছর পূর্ন হলো রাজধানীর গুলশানের হলি অার্টিজানের সেই মর্মান্তিক বাকরুদ্ধকর হামলার ঘটনার।

দিনটি ছিল শুক্রবার, রাত সাড়ে আটটার দিকে হঠাৎ করেই গুলশান-২ এর হলি আর্টিজান বেকারি নামের স্প্যানিশ রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়ে অস্ত্রধারী ৫ যুবক, ২০১৬ সালের ১লা জুলাই এ ঘটনাটি ঘটে। সন্ত্রাসীরা রেস্টুরেন্টে ঢুকে অস্ত্রের মুখে সবাইকে জিম্মি করে ফেলে, ওই রাতেই তারা ২০ জনকে হত্যা করে, যাদের মধ্যে ৯ জন ইতালি, ৭ জন জাপান, ৩ জন বাংলাদেশী এবং ১ জন ভারতীয় নাগরিক।

এছাড়া সন্ত্রাসীদের হামলায় দুজন পুলিশও প্রাণ হারায়। পরে হামলাকারী ০৫জন এবং উক্ত রেস্টুরেন্টের বাবুর্চি কমান্ডো অভিযান চলাকালে নিহত হয়। দেশে এধরনের বর্বরোচিত হামলার ছিল এটিই প্রথম। আতঙ্ক ও শোকে স্তব্ধ হয়ে যায় গোটা জাতি।

হলি অার্টিজানে নিহত বাবুর্চি সাইফুলের পরিবারের লোকজন সাইফুলের লাশটি নিজেদের বাড়িতে অানতে পারেন নি, তারা ঘটনার অাকস্মিকতায় এতোটাই মানসিকভাবে বিপর্যস্থ হয়ে পড়েন যে কোনভাবেই মেনে নিতে পারছেন না এই মৃত্যু।

সাইফুলের স্ত্রী এবং মা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন, কোন কথাই মুখে অানতে পারছেন না তারা, প্রতিবেদক কে ক্ষুব্দ হয়েই বলে বসলেন প্রতিবছর কি মনে করাতে অাসেন অামাদের সাইফুল গুলিতে নিহত হয়েছে? কই সারাবছর তো কেউ খবর রাখেন না পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ টার মৃত্যুর পরিবার টা কিভাবে চলছে?

তারা বলেন, হলি অার্টিজান রেস্টুরেন্টে কাজ করতে যাওয়ার অাগে বেশ কিছুদিন একই গ্রামে গড়ে ওঠা ডাঃ অালমগীর মতিনের মর্ডান ফ্যান্টাসী কিংডম ও চিড়িয়াখানায় কাজ করতেন, তার অাগে বেশ কয়েকবছর প্রবাসেও ছিলেন তিনি, সেখানেই তিনি ভালোমানের পিজা তৈরি করা শিখেন। দামী রেস্টুরেন্ট হলি অার্টিজানে ডাঃ অালমগীর মতিনের ছেলের মালিকানা থাকায় ডাঃ অালমগীর মতিন নিজেই সাইফুল কে পিজা তৈরির কাজে লাগিয়ে দেন ঐ রেস্টরেন্টে। সাইফুল চৌকিদার নিরপরাধ ছিলো পরিবারের দাবী তবে লাশটি কেনো পেলো না তা জানতে চান সাইফুলের পরিবারের স্বজনরা।

জঙ্গিদের সাথে সাইফুলের কোন সম্পৃক্ততা ছিলো না, তাহলে কেনো জঙ্গিদের লাশের ছবির সাথেতার ছবি? স্বজনদের দাবী সব জঙ্গীদের পরিচয় যেহেতু জানা হয়েছে অামাদের অন্তত একটা ব্যাবস্থা করে দেন, সাইফুলের সন্তানরা বড়ো হয়ে যেনো বাবার কবরটা দেখতে পায়?

উক্ত রেস্টুরেন্টের সবাইকে জিম্মি ঘোষণা করে হামকাকারিরা, খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অভিযান শুরু করে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে সেখানে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির শব্দ পাওয়া যায়।

তাৎক্ষণিক এই অভিযানে পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম ও বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাউদ্দিন নিহত এবং ৫০ জনেরও বেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য আহত হন।

 

এরপরের ঘটনা ছিলো অারো মর্মান্তিক, জঙ্গিরা একে একে ২০ জিম্মিকে নিষ্ঠুরভাবে জবাই করে হত্যা করে। প্রায় ১২ ঘণ্টার ওই ‘জিম্মি সংকট’ শেষ হয় সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযান ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’র মাধ্যমে।

‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’অভিযানে পাঁচ জঙ্গি ও রেস্টুরেন্টের বাবুর্চি সাইফুল ইসলাম চৌকিদার নিহত হন। নিহত সাইফুল ইসলাম শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার কলুকাঠি গ্রামের বাসিন্দা।

অপারেশন থান্ডারবোল্ট অভিযানে নিহত জঙ্গিরা হলেন, নিবরাস ইসলাম, মীর সামিহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জল ওরফে বিকাশ।

হোটেল থেকে উদ্ধার করা হয় হাসনাত করিম, তাহমিদ খানসহ ৩২ জিম্মিকে। ঘটনার তিন দিন পর ৪ জুলাই গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করে পুলিশ।

পরবর্তীতে হলি আর্টিজানে জিম্মিদশার বিভিন্ন ফাঁস হওয়া ভিডিও চিত্রে হাসনাত করিম ও তাহমিদকে রহস্যজনকভাবে চলা ফেরা করতে দেখা যায়। এ সময় জঙ্গিদের সঙ্গে তাদের বেশ ঘনিষ্টভাবে কথা বলতেও দেখা যায়।

রহস্যজনক আচরণের কারণে তাদের গোয়েন্দা কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তিন আগস্ট রাতে হাসনাত করিম এবং তাহমিদ হাসিব খানকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে তদন্তে তাহমিদের সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় মামলা থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়। আর হাসনাত করিমকে মূল মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।

 

ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে হামলার মাস্টারমাইন্ড তামিম চৌধুরী, নুরুল ইসলাম মারজান, চাকরিচ্যুত মেজর জিয়াউল হক, জোনায়েদ খানসহ বেশ কয়েকজনকে শনাক্ত করে গোয়েন্দারা। কবে হামলার পরিকল্পনা করা হয়, কারা অস্ত্র ও অর্থের যোগান দেয়, প্রযুক্তিগত সহায়তা কারা করে ‘সবকিছুরই ক্লু পায়’ পুলিশ।

দেশব্যাপী জঙ্গিবিরোধী অভিযানে তামিম, মারজান, মেজর জাহিদ, তানভীর কাদেরীসহ ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্তত ৮ জন নিহত হন।

“মালিকানা এবং বৈধতা”- গুলশান ২ নম্বর সেকশনের ৭৯ নম্বর সড়কে ১০ কাঠার প্লটের উপর দোতলা ভবনে গড়ে ওঠা হলি আর্টিজান বেকারি বিদেশিদের কাছে জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু যথাযথ অনুমোদন ছিলো না, তাই সাংবাদিকদের একজনের প্রশ্ন ছিলো, অনুমতি না নিয়ে ব্যবসা পরিচালনার জন্য হলি আর্টিজানের মালিকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না? এই প্রশ্নে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, এজন্য ক্যাফেটির মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রথমে মন্ত্রী বলেন, “আর্টিজানের মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিৎ।”

মন্ত্রীর অস্পষ্ট উত্তরে সাংবাদিকরা পুনরায় প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “যাব (ব্যবস্থায়), নিশ্চয়ই যাব।” ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

হলি আর্টিজান বেকারির তিনজন মালিক। এর মধ্যে পরাগই সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিলেন, হামলার দিন তিনি থাইল্যান্ড ছিলেন বলে জানাগেছে। হামলার সমসাময়িক দিনগুলোতে গুলোতে বার্তা সংস্থা এপিকে তিনি জানিয়েছেন, বর্তমানে তিনি থাইল্যান্ডে অবস্থান করছেন। সেখানে তিনি একটি রেস্টুরেন্ট চালু করতে যাচ্ছেন। সেটি নিয়েই তিনি ব্যস্ত। তবে তিনি কবে থেকে থাইল্যান্ডে অবস্থান করছেন, কবে দেশে ফেরার কথা, তার অন্য দুইজন পার্টনার কারা, তারা কোথায় সে বিষয়ে এপির প্রতিবেদনে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। তবে হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টের ফেসবুক ফ্যান পেজ থেকে জানা যায়, রেস্টুরেন্টের তিন পার্টনারের একজন হচ্ছেন পরাগের স্ত্রী লিলিয়ান এবং একজন তার বন্ধু সাদাত।

২০১৪ সালের ১৫ জুন রেস্টুরেন্টটি চালু করা হয়। সপ্তাহে রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৮ টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এটি চালু থাকে।

 

এইচ এম অাতিক ইকবাল, স্টাফরিপোর্টার।

ThemesBazar.Com

     এই বিভাগের আরো খবর