মঙ্গলবার, ২০ অগাস্ট ২০১৯, ০৪:১৫ পূর্বাহ্ন




শ্রীলঙ্কায় হামলা এবং বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদঃ দুর্বল ও ভেঙে পরা সমাজ

  • ক্রাইম ওয়াচ / অপরাধ অনুসন্ধানে ২৪ ঘণ্টা / আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩ মে, ২০১৯
শ্রীলঙ্কায় বোমা হামলায় লণ্ডভণ্ড গির্জা।। ছবি- সংগৃহীত

গত ২১ এপ্রিল ২০১৯, ঈস্টার সানডে তে খুব দুঃখজনক একটি ঘটনা ঘটে যায়। দক্ষিন এশিয়ার এবং আমাদের প্বার্শবর্তী দেশ শ্রীলঙ্কায় ভয়ঙ্কর বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। সন্ত্রাসীরা হামলা চালায় দুটি গীর্জা এবং তিনটি আন্তর্জাতিক হোটেলে। এই ঘৃণিত ঘটনায় প্রায় ৪০০ মূল্যবান প্রান ঝড়ে গেছে। এঈ লাইন গুলো বিগত পাঁচ খবরের পাতায় টিভির নিউজবারে চোখের সামনে ভেসে আসছিলো। কেমন যেন একগুয়ে মনে হচ্ছিল খবরগুলো দেখে, হয়তোবা অনেকেরেই এরকমই মনে হয় হয়তোবা সবারই এমন লাগছিল। লেখাটা হয়তো অনেকের পড়ার সময় কপাল কুঁচকানোর কারন হবে কিন্তু ঘটনা টা সেরকমই কি নয়?

স্মৃতির পাতায় শুধু এই খবরগুলই বার বার জানান দিয়ে যায় যে সন্ত্রাস কতটা হিংস্র হতে পারে আর এর শিকার মানুষগুলো কতটা অসহায়। নিউজিল্যান্ডের সেই শ্বেতাঙ্গ সুপ্রিমিস্ট এর কিছুদিন পরের এই ঘটনা খুব নাড়া দিয়ে উঠার মতো। সেই ৯/১১ এর সময় সবেমাত্র বুঝতে শিখেছি, সাদাকালো টিভিতে দেখছিলাম লাইভ কাভারেজ এক বিভীষিকাময় অনুভূতি। এরপর ধীরে ধীরে শুধু দেখতে থাকা, আল-কায়দা, তালিবান, বোকো হারাম, লস্কর ই তায়েবা ইত্যাদি। ভারতে হিন্দু উগ্রপন্থী এবং মায়ানমারে বৌদ্ধ উগ্রপন্থীদের কথাও উল্লেখযোগ্য। আমাদের একটা পরিচিত লাইন ছেলেবেলা থেকেই শেখানো হয়েছে, প্রতিকার এর চেয়ে প্রতিরোধ কার্যকরী। কিন্তু ধরুন আপনার কোন ক্রনিক চর্ম জনিত রোগ হয়েছে, আপনি ঠিক কতদিন পর্যন্ত প্রতিরোধ করবেন? বের তো হয়ে আসবেই।

ধর্মের ছদ্মবেশে ‘উগ্রপন্থী’ আচরন একটি ক্রনিক রোগের রূপ নিয়েছে বর্তমান দুনিয়াতে। তাই তদানীন্তন এই প্রতিরোধের প্রক্রিয়া আর কার্যকরী থাকছে না। শ্রীলঙ্কান সরকার অন এরাইভাল ভিসা বন্ধ করে দিল, স্পেশাল টাস্ক ফোরস একের পরে এক মিশন চালিয়ে যাচ্ছে, বোরকায় মুখ ঢাকা নিষিদ্ধ করা হলো। ঠিক একই ব্যাপার ফ্রান্সেও করা হলো, নিউজিল্যান্ডেও ভিসাজনিত বিড়ম্বনা বেড়ে গেল। এগুলো লেখার উদ্দেশ্য এই যে এই উদ্যোগগুলো কি আসলে কোন সমাধান দিতে পারলো? হলে আরটিসেনের ঘটনার বাংলাদেশে জঙ্গি নিধনের কাজ শুরু করা হলো। আত্মঘাতী হামলাতে কেউ মরলো এবং শুট টূ কিল মিশনে কেউ মরলো। সেই ৯/১১ এর পরে আমেরিকা মুসলিম অভিবাসীদের নিয়ে আগ্রাসী ভূমিকা গ্রহন করে ফেললো মুসলিম নামের সাথে যুক্ত হয়ে পরে পশ্চিমা ইমিগ্রেশনের বিভীষিকা। তবে এসব চিন্তা থেকে সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই ভয়াবহতায় জীবন হারানো যুবক, শিশু, বৃদ্ধ এদের কথা। মূল বিষয়টা হলো আক্রান্ত দেশগুলো যেই পদক্ষেপ গুলো নিচ্ছে তা কি আসলে স্থায়ীভাবে গ্লোবাল এই সন্ত্রাসবাদকে নির্মূল করতে কার্যকরী কিনা।

কোন মতামত নয় কিন্তু রেকর্ড কি বলে? শুধু দক্ষিন এশিয়ার তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো নয়, বৈশ্বিক এই সন্ত্রাসবাদের বিভীষিকার শিকার হয়েছে কানাডা, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, নরওয়ে এবং নিউজিল্যান্ড এর মতো পশ্চিমা উন্নত দেশ গুলো। এরপরেও কেন উদ্যোগ এমন হচ্ছে না যে শিকরটা কোথায় তা বের করে ফেলা। অক্সফাম একটি বেসরকারী বৈশ্বিক সংস্থার তথ্যমতে পৃথিবীর বড় বড় প্রতিটা মুসলিম দেশ থেকে আফ্রিকা ও মধ্য এশিয়াতে একটি বড় অংশের যাকাত আসে যা মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি অপরিহার্য কর্তব্য। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো মুসলিম ভাইদের এই অর্থ আসলে তারা যেই জন্য প্রেরন করছে সেই জায়গাতে যাচ্ছে কিনা এই বিষয়টি তদারকির কোন সুযোগ আর থাকে না। ঠিক একই রিপোর্ট আসে গ্লোবাল হিউম্যানিটি এসিস্ট্যান্স (জি এইচ এ) এর পক্ষ থেকে। প্রশ্ন আরো বেড়ে যায়, ভেবে দেখুন ন্যাটো তাহলে কি করছে? আসলেই ন্যাটোকে যেই উদ্দেশ্যে তৈরী করা হয়েছে সেই উদ্দেশ্যই বলবত আছে তো। ফরেইন অ্যাফেয়ার্স একটি খোদ আমেরিকান ভিত্তিক ম্যাগাজিন জানিয়েছে যে ইরোপিয়ান ইউনিয়ন এর কয়েকটি দেশই বলছে ন্যাটোর গঠনগত পরিবর্তন দরকার।

কিছু জিনিসে তবু সাধারণ পরিবর্তন আনা দরকার, যেটা শুরু হবে আমাদের থেকে মানে গন মানুষ থেকে। আমাদের একটা কথা মাথায় রাখা উচিৎ যে একটি সমাজই একটি অপরাধীকে জন্ম দেয়। সে সমাজই তাকে ফুলে ফেঁপে উঠতে দেয়। এটা বিশ্বায়নের যুগ, পুরো পৃথিবী এখন সীমানাবিহীন। তাই সমাজ বলতে আমদের এখন আর আলাদা আলাদা করে পশ্চিমা সমাজ বা প্রাচ্যীয় সমাজের এর মধ্যেই চিন্তাধারা সীমাবদ্ধ রাখলে হচ্ছে না আর কারন সন্ত্রাসবাদ কোন সীমারেখা তে আর নেই। ইংল্যান্ডের কিশোরীও আই এস এর সদস্যরুপে জাহির হয়েছে। নতুন এক সমাজ ব্যবস্থা ইতোমধ্যে দাঁড়িয়ে গেছে তা হলো বৈশ্বিক সমাজ। এই সমাজকে ভাঙতে দেয়া যাবে না কারণ এই সমাজের দুর্বলতার জন্যই আজ এই ভয়াবহতার সুযোগ পাচ্ছে এবং সন্ত্রাসবাদের বীজ থেকে ধীরে ধীরে গাছ বেড়িয়ে আসছে। কীভাবে এই সমাজ দুর্বল হচ্ছে? এই সমাজ দুর্বল হচ্ছে ঘৃণায়, যে ঘৃণা আপনার আমার মতো সাধারণ মানুষের নয় হোক সে যে কোন জাতীয়তার।

ইতিহাস বলে যে ঘৃণা থাকতো শুধু নেতার সাথে নেতার। আজ এই জঙ্গিবাদের রসদ কি বৈশ্বিক কোন না কোন নেতাদের ঘৃণার ফসল? সেটা ভয়ঙ্কর। কিন্তু ব্যাপারটা কাউন্টার হয়ে যাবে যদি গোড়া থেকে প্রতিটা দেশের প্রতিটা শান্তিপ্রিয় জনগন তাদের বিশ্বাস এবং তাদের বিশেষত তাদের মানবিকতাকে এই সন্ত্রাসের নেশায় আবদ্ধ না করে ফেলে। মনে কোন ধর্মই মানবিকতার বাইরে কথা বলে না। তাই সমূলে এই মাথাচাড়া দিয়ে উঠা সন্ত্রাসবাদ নামক দানবকে স্থায়ী ভাবে সরিয়ে ফেলার জন্য এবং পৃথিবীতে মানবিকতা টিকিয়ে রাখার জন্য দরকার এই বৈশ্বিক সমাজকে ভালোভাবে গড়ে তোলা যেখানে আপনি আমি বলতে পারবো যে পুরো পৃথিবীটা একটি সুন্দর জায়গা।
এ এস এম অনিক
ক্রিমিনোলোজি বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..








© ২০১৯ সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত “ক্রাইম ওয়াচ
Theme Download From ThemesBazar.Com